প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা প্রশ্ন – উত্তর | WB Class 10 History Chapter 3 – Question Answer

bidroho-o-protirodh-question-answer
শ্রেণি – দশম | বিভাগ – ইতিহাস | অধ্যায় – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ: বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা | Protirodh o Bidroho Boisisto o Porjalochona (Chapter 3)

এই পর্বে রইল দশম শ্রেণির ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় অধ্যায়  – প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ – বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা থেকে সম্পূর্ণ প্রশ্ন উত্তর আলোচনা। প্রশ্ন উত্তর আলোচনা শুরু করার আগে, আমরা তোমাদের একটি বিশেষ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।

আমরা জানি যে ভালো ভাবে প্রশ্ন – উত্তর তৈরি করলেও পরীক্ষায় অনেক ছাত্রছাত্রী ভালোভাবে লিখতে পারে না। এই সমস্যার একটি সমাধান আমরা তোমাদের দিতে চাই; লক্ষ্য করবে প্রতিটি বড় প্রশ্নের শেষে আমরা কয়েকটি বিশেষ KeyPoints উল্লেখ করেছি। ঐ বড়প্রশ্নগুলির মূল বিষয়গুলিই KeyPoints হিসাবে তোমাদের দেওয়া হয়েছে। ঐ KeyPoints গুলো যদি তোমরা মনে রাখতে পারো আমাদের বিশ্বাস সেক্ষেত্রে বড়প্রন্সের উত্তর লিখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না।

সঠিক উত্তর নির্বাচন কর (MCQ)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ১]

১। বারাসাত বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন-
(ক) দুদু মিঞা (খ) দিগম্বর বিশ্বাস (গ) তিতুমির (ঘ) বীরসা মুন্ডা
উত্তর- বারাসাত বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন (গ) তিতুমির

২। সুই মুন্ডা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন-
(ক) চুয়াড় বিদ্রোহে (খ) কোল বিদ্রোহে (গ) সাঁওতাল বিদ্রোহে (ঘ) মুন্ডা বিদ্রোহে [মাধ্যমিক’১৭]
উত্তর – সুই মুন্ডা (খ) কোল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৩। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের অরণ্য আইনে অরণ্যকে ভাগ করা হয়-
(ক) দুটি স্তরে (খ) তিনটি স্তরে (গ) চারটি স্তরে (ঘ) পাঁচটি স্তরে [মাধ্যমিক’১৭]
উত্তর- ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের অরণ্য আইনে অরণ্যকে (খ) তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়।

৪। কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত হয়েছিল –
(ক) মেদিনীপুর (খ) ঝাড়গ্রাম (গ) ছোটনাগপুর (ঘ) রাঁচি [মাধ্যমিক’১৮]
উত্তর- কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২ খ্রিস্টাব্দ) অনুষ্ঠিত হয়েছিল (গ) ছোটনাগপুর অঞ্চলে।

৫। ভারতে প্রথম অরণ্য আইন পাস হল-
(ক) ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে (খ)১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে (গ) ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে (ঘ) ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে [মাধ্যমিক’১৮]
উত্তর- ভারতে (গ) ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম অরণ্য আইন পাস হয়।

৬। তিতুমিরের প্রকৃত নাম ছিল-
(ক) চিরাগ আলি (খ) হায়দ্রার আলি (গ) মির নিসার আলি (ঘ) তোরান আলি [মাধ্যমিক’১৯]
উত্তর- তিতুমিরের প্রকৃত নাম ছিল (গ) মির নিসার আলি।

৭। সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেত্রী ছিলেন –
(ক) রানি কর্নাবতী (খ) রানি শিরোমণি (গ) দেবী চৌধুরানী (ঘ) রানি দুর্গাবতী [মাধ্যমিক’১৯]
উত্তর- সন্ন্যাসী ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেত্রী ছিলেন – (গ) দেবী চৌধুরানী।

৮। দ্বিতীয় অরণ্য আইনে (১৮৭৮) লাভবান হয়েছিল –
(ক) আদিবাসী সম্প্রদায় (খ) ব্রিটিশ সরকার (গ) ব্যবসায়ী শ্রেণী (ঘ) ব্রিটিশ সরকার ও আদিবাসি শ্রেণী উভয়েই [মাধ্যমিক’২০]
উত্তর-দ্বিতীয় অরণ্য আইনে (১৮৭৮) লাভবান হয়েছিল (ঘ) ব্রিটিশ সরকার ও আদিবাসি শ্রেণী উভয়েই।

৯। হুল কথাটির অর্থ হল-
(ক) ঈশ্বর (খ) স্বাধীনতা (গ) অস্ত্র (ঘ) বিদ্রোহ [মাধ্যমিক’২০]
উত্তর- হুল কথাটির অর্থ হল (ঘ) বিদ্রোহ।

১০। ভিল বিদ্রোহের নেতা ছিলেন –
(ক) তিতুমির (খ) বিরসা মুন্ডা (গ) শিউরাম (ঘ) দুদুমিয়া
উত্তর- ভিল বিদ্রোহের নেতা ছিলেন – (গ) শিউরাম

আরো পড়ো → ইতিহাস দ্বিতীয় অধ্যায় প্রশ্ন – উত্তর

অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন (VSAQ)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ১]

১। মোপলা বিদ্রোহ কোথায় সংঘটিত হয়? 
উত্তর- দক্ষিন ভারতের মালাবার অঞ্চলে মোপলা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।

২। ফরাজি আন্দোলনের সূচনা কোথায় হয়েছিল? [মাধ্যমিক’১৫]
উত্তর- ফরাজি আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ফরিদপুরে।

৩। উলগুলান বলতে কি বোঝায়? [মাধ্যমিক’১৭]
উত্তর- উলগুলান বলতে মুন্ডাদের সশস্ত্র বিপ্লবকে বোঝায়।

৪। কত খ্রিস্টাব্দে নীল কমিশন গঠিত হয়? [মাধ্যমিক’২০]
উত্তর- ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নীল কমিশন গঠিত হয়।

৫। দুদু মিয়ার অন্য নাম কি?
উত্তর- দুদু মিয়ার অন্য নাম মহম্মদ মহসিন।

৬। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল কোথায়?
উত্তর- সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ঢাকায়।

৭। ওয়াহাবি শব্দের অর্থ কি?
উত্তর- ওয়াহাবি শব্দের অর্থ নবজাগরণ।

৮। নীল বিদ্রোহের সূচনা কবে হয়েছিল?
উত্তর- নীল বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে।

৯। চুয়াড় বিদ্রোহের সময় ভারতের বড়লাট কে ছিলেন?
উত্তর- চুয়াড় বিদ্রোহের সময় ভারতের বড়লাট কে ছিলেন লর্ড ওয়েলেসলি।

১০। দিকু কথার অর্থ কি?
উত্তর- দিকু কথার অর্থ বহিরাগত ব্যবসায়ী।

আরো পড়ো → অসুখী একজন কবিতার প্রশ্ন উত্তর

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ২]

১। ফরাজী আন্দোলন কি ধর্মীয় পুনর্জাগরণের আন্দোলন?
উত্তর – পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরের এক ধর্মবিজ্ঞানী হাজী শরীয়ত উল্লাহ ১৮০৪ সালে ফরাজী আন্দোলনের সূচনা করেন।প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলনের প্রেরণা এসেছিল ইসলামী ধর্মসংস্কার আন্দোলন থেকেই।ফরাজী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিলো ধর্মীয় সংস্কারের বা পুনর্জাগরণের উদ্দেশ্যে কিন্তু শেষপর্যন্ত তা একটি কৃষক আন্দোলনের চরিত্রে উপনীত হয়।এই আন্দোলনের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল সংকীর্ণ ধর্মবোধ।

২। নীলকররা নীল চাষীদের ওপর কিভাবে অত্যাচার করত তা সংক্ষেপে লেখ?
উত্তর – ঊনবিংশ শতকের সূচনাপর্ব থেকেই বাংলায় নীলচাষের সূত্রপাত হয়। ইংরেজ নীলকর সাহেবরা ভারতীয় কৃষকদের নীলচাষ করতে বাধ্য করে ও নানাভাবে নীলচাষীদের ওপর অত্যাচার শুরু করে যেমন-
ক) নীলচাষীদের দৈহিক নিপীড়ন করা
খ) চাষীদের গৃহে আগুন লাগিয়ে দেওয়া
গ) বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খাটানো
ঘ) ১৮৩০র পঞ্চম আইন দ্বারা নীলচাষীদের বলপূর্বক দাদন নিতে বাধ্য করা ও তা শোধ করতে না পারলে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করা।

৩। দুদু মিয়াঁ স্মরণীয় কেন?
উত্তর – ১৮৩৭ সালে ফরাজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণের পর মহম্মদ মহসিন বা দুদু মিয়াঁ ফরাজী আন্দোলনকে সামাজিক,অর্থনৈতিক, ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপায়িত করেন। দুদু মিয়াঁ ঘোষণা করেন জমির মালিক হল আল্লাহ ,যার ফলে সেই জমির উপর খাজনা ধার্যের কোনো এক্তিয়ার জমিদারের নেই। দুদু মিয়াঁ ছিলেন একজন দৃঢ় ও অভিজ্ঞ সংগঠক, যিনি সমগ্র বঙ্গদেশকে কয়েকটি হল্কা এ বিভাজিত করেন ও সেই হল্কাগুলিতে জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। ফলে ফরাজী আন্দোলন পূর্ববঙ্গের বিভিন্নস্থানে বিস্তৃতিলাভ করে।

৪। সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো কেন?
উত্তর – বাংলায় ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলেন সন্ন্যাসী ও ফকির সম্প্রদায়। বাংলা ও বিহারের কৃষকরাও এতে যুক্ত হয়। এই সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ প্রায় ৪০ বছর ধরে চলে, এর ব্যর্থতার কারণগুলি হলো –
ক) যোগ্য নেতৃত্বের অভাব,যা এই বিদ্রোহে নেতৃত্বের দুর্বলতাকে প্রকট করে।
খ) আদর্শহীনতা
গ) উপযুক্ত ও কার্যকরী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র যা সশস্ত্র বিদ্রোহের পক্ষে প্রয়োজনীয় ছিল, তার অভাব এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।

৫। খুৎকাটি প্রথা বলতে কি বোঝ?
উত্তর – ছোটনাগপুর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী মুন্ডা উপজাতিদের সমাজে প্রচলিত জমির যৌথ-মালিকানা সংক্রান্ত প্রথা খুৎকাটি প্রথা নামে পরিচিত ছিল।এই খুৎকাটি প্রথায় চাষ করা জমি পরিচিত ছিল খুন্ডকাটি নামে,যার অর্থ ‘জনগোষ্ঠীর যৌথ-মালিকানা’-১৮৯৯-১৯০০ সালে হওয়া মুন্ডা বিদ্রোহের অন্যতম কারণ ছিল ব্রিটিশদের দ্বারা নতুন প্রচলিত ভুমিরাজস্ব প্রথার সূচনার জন্য খুৎকাটি প্রথার সমাপ্তি ঘটানো।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের আলোচনা↓

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ৪]

১। চুঁয়াড় বিদ্রোহকে ‘চুঁয়াড় বিপ্লব’ বললে কেন ভুল বলা হবে?
উত্তর – বিদ্রোহ বলতে সাধারণত বোঝায় যখন স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণী অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় শাসন যদি অপশাসনে পর্যবসিত হয় তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয় তার বহিঃপ্রকাশ হলো বিদ্রোহ, বাংলার আদিবাসী সম্প্রদায় চুয়াড়দের মধ্যে এই বিদ্রোহেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
অপরদিকে বিপ্লব হল সামাজিক বা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন, অর্থাৎ সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যদি বিদ্রোহ হয় তাহলে তার ফলে ঘটা পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনই হলো বিপ্লব।
বাংলার চুয়াড় নামক আদিবাসী সম্প্রদায়ের দ্বারা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল (১৭৬৯-১৭৯৯)। চুয়াড় রা মূলত বসবাস করত মেদিনীপুর জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশ, বাঁকুড়া,পুরুলিয়া অঞ্চলে। ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত এই বিদ্রোহ সীমিত অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল ও এর ফলে ব্যাপক অংশ জুড়ে পূর্নাঙ্গ পরিবর্তন ঘটেনি তাই একে বিপ্লব না বলে বিদ্রোহ বলাই সঙ্গত।
KeyPoints

বিদ্রোহ এবং বিপ্লবের পার্থক্য – চুয়াড় আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ – ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় – এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল

২। তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্য কি ছিল?
উত্তর – ১৮৩০-৩১ সালে বাংলায় তিতুমীরের নেতৃত্বে একটি ধর্মীয় আন্দোলন তথা বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল, যা তারিকাহ-ই-মোহম্মদিয় নামে পরিচিত, এই বিদ্রোহ ঐতিহাসিকমহলে বারাসাত বিদ্রোহ নামেও খ্যাত।

তিতুমীর যাঁর প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ মীর নিসার আলী,তাঁর অনুগামীর সংখ্যা ছিল প্রচুর ও মূলত দরিদ্র মুসলমান কৃষক ও তাঁতিরা ছিল তাঁর অনুগামী। তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা,নদীয়া, ফরিদপুর অঞ্চলের অধিকার নিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরূদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। তিতুমীরের আন্দোলনের প্রারম্ভিক লক্ষ্য ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরণ। তবে শুধু তাই নয়, তাঁর এই বিদ্রোহ সাহেবদের, জমিদার ও মহাজনদের গরিব কৃষকদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলাও অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষদের প্রতি অবিচার ও তাদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বা উদ্যেশ্যে তিতুমীরের এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ধৰ্মীয় আন্দোলন মনে হলেও জমিদার, সাহেব, মহাজন ও সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যেই এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে’র মতে তিতুমীরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল ইসলামে পূর্ন বিশ্বাস এবং হিন্দু কৃষকদেরকে সাথে নিয়ে ইংরেজ মদতপুষ্ট জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা।
KeyPoints

তিতুমীরের নেতৃত্বে ধর্মীয় আন্দোলন – ব্রিটিশ শাসনের বিরূদ্ধে আন্দোলন – প্রারম্ভিক লক্ষ্য ছিল ইসলামের শুদ্ধিকরণ – গরিব কৃষকদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন

৩। ‘জমিদার সভা’-র কার্যাবলী বর্ণনা করো।
উত্তর – ঊনবিংশ শতকের তিরিশের দশক থেকেই বাঙালি শিক্ষিত সমাজ ও জমিদারশ্রেণী নিজেদের স্বার্থরক্ষায় সচেস্ট হয়ে ওঠে। এই উদ্যেশে ১৮৩৮ সালের মার্চ মাসে টাউন হলে একটি সভা বসে, যার নেতৃত্ব দেন রাধাকান্ত দেব। সংকীর্ণ জাতিভেদ প্রথা ও অঞ্চলিকতাবাদকে প্রশ্রয় না দিয়েই এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভাই জমিদার সভা নামে পরিচিত। যার প্রাণপুরুষ ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। এই জমিদার সভা বেশ কয়েকটি কার্যাবলীর প্রস্তাব দেয় যেগুলো নিম্নরূপ।

ক. জমিদারের ও নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য তারা ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি পেশ করে
খ. পূর্বে প্রচলিত নিস্কর ভুমিদান প্রথা ফিরিয়ে আনার জন্য সচেষ্ট হয়
গ. বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, ও রাজস্ব বিভাগের সংস্কার করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানায় জমিদার সভা।
ঘ. ব্রিটিশ কোম্পানির আমলাতন্ত্র নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে ও সারা ভারত জুড়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রচলনের দাবি জানায়।
ঙ. শাসনবিভাগের সংস্কার ও জমিদার সভার একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী।

KeyPoints 

জমিদারশ্রেণীর নিজেদের স্বার্থরক্ষায় সভা – নেতৃত্বে রাধাকান্ত দেব – স্বার্থরক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি পেশ – প্রধান দাবীগুলি – নিস্কর ভুমিদান প্রথা ফিরিয়ে আনা – বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, ও রাজস্ব বিভাগের সংস্কার – সারা ভারত জুড়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রচলনের দাবী

আরো পড়ো → নদীর কাজ বড় প্রশ্ন – উত্তর

রচনাধর্মী প্রশ্নউত্তর (LA)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ৮]

১। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করো।
উত্তর – ১৮৫৭ সালে মধ্য ও উত্তর ভারতের কিছুকিছু স্থানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়। ১৮৫৭ সালের ২৯এ মার্চ বাংলার ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডে নামক এক সিপাহী একজন উর্দ্ধতন ব্রিটিশ সেনা অফিসারকে লক্ষ্য করে গুলি করে ও হত্যা করে ও সেই ঘটনার সাথে সাথে বিদ্রোহ জোরালোভাবে দেশের বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। মিরাট, লখনৌ, আম্বালা, দিল্লি,অযোধ্যা প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।

মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি
ক) মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বা চরিত্র কি ছিল তাই নিয়ে বহু ঐতিহাসিক বিবিধ মতপ্রকাশ করেছেন। বেশ কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে মহাবিদ্রোহ ছিল মূলত সিপাহী বিদ্রোহ। এই মত পোষণ করেছেন জন লরেন্স, চার্লস রেক্স,ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, সৈয়দ আহমেদ, দাদাভাই নৌরোজি, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কিশোরীচাঁদ মিত্র প্রমুখেরা। এদের মতে এই বিদ্রোহ ছিল পুরোপুরি সিপাহীদের বিদ্রোহ, অসামরিক মানুষের অসন্তোষ এক্ষেত্রে অপ্রধান ঘটনা ছিল। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে এই বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল সেনাদের নিয়ে, শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও ঘটে।

খ) বেশকিছু ঐতিহাসিক তথা বিশিষ্টজনের মতে এই বিদ্রোহ ছিল জাতীয় বিদ্রোহ অর্থাৎ এঁরা জাতীয়তাবাদের নিরিখে এই বিদ্রোহকে বিচার করেছেন। ‘New York daily tribune’ পত্রিকায় কার্ল মার্ক্স এই বিদ্রোহকে জাতীয় বিদ্রোহ বলেছেন। ভারতীয়দের মধ্যে ভি.ডি সাভারকার প্রথম এই বিদ্রোহকে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার আওতায় এনেছেন ও ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন। এস.বি.চৌধুরী এই মতকেই সমর্থন করে বলেছেন “এই বিদ্রোহে অনেক শ্রেণীর মানুষ একসঙ্গে বিদেশিশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল,দূরের হলেও এটিই ছিল পরবর্তীকালের ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে প্রকৃত পদক্ষেপ”। এছাড়াও সুশোভন সরকার,পি.সি.যোশী প্রমুখেরা ১৮৫৭র বিদ্রোহকে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলেছেন।

গ) এই বিদ্রোহ যতটা সিপাহী বিদ্রোহ ছিল তার চেয়ে অধিক ছিল ‘গণবিদ্রোহ’, এই মত পোষণ করেন ড: শশীভূষণ চৌধুরী,জে.বি.নর্তন প্রমুখ।

ঘ) আধুনিক অর্থে এই বিদ্রোহ জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ছিল না, এই নিয়ে ঐক্যমত লক্ষ্য করা যায়। টমাস মেটাকাফ মন্তব্য করেছেন যে এই বিদ্রোহ কখনো কখনো সিপাহী বিদ্রোহকে ছাপিয়ে গেলেও জাতীয় বিদ্রোহের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। কারণ এর জনপ্রিয়তা মূলত উত্তরভারত ও মধ্যভারতের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে রণজিৎ গুহ, ড: হরপ্রসাদ চ্যাটার্জির মতো আধুনিক ঐতিহাসিকরা সিপাহী বিদ্রোহের মধ্যে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান ও ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

KeyPoints

১৮৫৭ সালের ২৯এ মার্চ সূত্রপাত – ব্যারাকপুর মঙ্গল পান্ডে – মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ঐতিহাসিক বিবিধ মত – অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে মহাবিদ্রোহ ছিল মূলত সিপাহী বিদ্রোহ – সাধারণ মানুষের যোগদান ছিল সীমিত – ভি.ডি সাভারকার প্রথম এই বিদ্রোহকে জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার আওতায় এনেছেন – আধুনিক অর্থে এই বিদ্রোহ জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ছিল না, এই নিয়ে ঐক্যমত লক্ষ্য করা যায় – কারণ এর জনপ্রিয়তা মূলত উত্তরভারত ও মধ্যভারতের কিছু অংশে সীমাবদ্ধ ছিল

২। মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো।
উত্তর – মহাবিদ্রোহ পরবর্তী ইতিহাস পরম্পরায় যে কটি উপজাতি বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল তার মধ্যে মুন্ডা বিদ্রোহ (১৮৯৯-১৯০০) অন্যতম। ছোটনাগপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী মুন্ডা উপজাতির মানুষেরা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে বিদ্রোহে অবতীর্ন হয়।এই বিদ্রোহের কারণগুলি হলো-
ক) ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় অরণ্য-আইন বা ঔপনিবেশিক অরণ্য-আইন পাশ করে যা ভারতের অরণ্য সম্পদের ওপর ভারতীয় নাগরিক তথা অরণ্যবাসীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, এমনকি অরণ্যবাসী উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষের জীবিকা নির্ধারণের পথেও বাধা সৃষ্টিকারী হয়ে ওঠে।
খ) বাইরে থেকে আসা মহাজন, ঠিকাদার, জমিদারদের আবির্ভাব হয় ও তারা মুণ্ডাদের ওপর বিবিধ করের ও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়, ও বিভিন্নভাবে অত্যাচার করতে থাকে-যেমন-বিনা পারিশ্রমিকে বেগার খাটানো।
গ) কিছু খ্রিস্টান মিশনারি মুণ্ডাদের বসতি এলাকায় খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হয়ে ওঠে ও ধর্মান্তরিতকরণে লিপ্ত হয়,যার ফলে মুন্ডারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।
ঘ) ব্রিটিশদের দ্বারা নতুন ভুমিরাজস্ব ব্যবস্থার সূচনা হলে জমির যৌথ মালিকানা সংক্রান্ত মুন্ডা সমাজে প্রচলিত ‘খুৎকাঠি প্রথার’ সমাপ্তি ঘটে,যার দরুন মুন্ডারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।

মুন্ডা বিদ্রোহের গুরুত্ব-
১৮৯৯-১৯০০ সাল পর্যন্ত হওয়া মুন্ডাবিদ্রোহ আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও এর সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব আমরা দেখতে পাই।
ক) এই বিদ্রোহে মুন্ডা উপজাতীর সমস্ত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
খ) এই বিদ্রোহের অন্যতম সাফল্য ও গুরত্ব হলো ঠিক কয়েকবছর পরেই ১৯০৮ সালে সরকার ছোটনাগপুরে ‘প্রজাস্বত্ব আইন’ পাশ করে যার মাধ্যমে মুণ্ডাদের চিরাচরিত জমির মালিকানা সংক্রান্ত খুৎকাঠি প্রথা স্বীকার করে নেওয়া হয়।
গ) বিরসা মুন্ডা তাঁর উপজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন তা থেকে অন্যান্য উপজাতিরাও অনুপ্রেরণা পেয়েছিল।
ঘ) আদতে এই বিদ্রোহ কৃষক আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী।এই বিদ্রোহ মুন্ডা সহ অন্যান্য উপজাতিদের রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক বেশি সচেতন করে তোলে।

KeyPoints 

মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ – ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় অরণ্য-আইনের বিরোধিতা – মহাজন, ঠিকাদার, জমিদারদের অত্যাচার – খ্রিস্টান মিশনারি মুণ্ডাদের বসতি এলাকায় খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্যোগ – ‘খুৎকাঠি প্রথার’ সমাপ্তি
মুন্ডা বিদ্রোহের গুরুত্ব – আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হলেও প্রভাব সুদূরপ্রসারী – ১৯০৮ সালে সরকার ছোটনাগপুরে ‘প্রজাস্বত্ব আইন’ পাশ এবং খুৎকাঠি প্রথা স্বীকার – মুন্ডা উপজাতির লড়াই থেকে অন্যান্য উপজাতিরাও অনুপ্রেরণা – আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী।

আরো পড়ো → ইতিহাসের ধারণা প্রশ্ন উত্তর

WBPorashona.com-এর পোস্ট আপডেট নিয়মিত পাবার জন্য –


আমাদের কাজ থেকে উপকৃত হলে এই লেখাটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।

WBP-YT-Banner