বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন প্রশ্ন ও উত্তর | Bish Shotoker Bharote Nari, Chatro o Prantik Jonogostthir Andolon Question Answer

মাধ্যমিকে প্রতিটি অধ্যায়ের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার সেরা উপায় ↓

WBP-CT-Banner_offer
bish-shotoker-varote-nari-chatro-prantik-jonogosthir-andolon-solution
শ্রেণি – দশম | বিভাগ – ইতিহাস | অধ্যায় – বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন | bish shotoker bharote nari, chatro o prantik jonogostthir andolon (Chapter 7)

এই পর্বে রইল দশম শ্রেণির ইতিহাস বিভাগের সপ্তম অধ্যায় – বিশ শতকের ভারতে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ প্রশ্ন উত্তর আলোচনা। প্রশ্ন উত্তর আলোচনা শুরু করার আগে, আমরা তোমাদের একটি বিশেষ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।

আমরা জানি যে ভালোভাবে প্রশ্ন – উত্তর তৈরি করলেও পরীক্ষায় অনেক ছাত্রছাত্রী ভালোভাবে লিখতে পারে না। এই সমস্যার একটি সমাধান আমরা তোমাদের দিতে চাই; লক্ষ্য করবে প্রতিটি বড় প্রশ্নের শেষে আমরা কয়েকটি বিশেষ KeyPoints উল্লেখ করেছি। ঐ বড় প্রশ্নগুলির মূল বিষয়গুলিই KeyPoints হিসাবে তোমাদের দেওয়া হয়েছে। ঐ KeyPoints গুলো যদি তোমরা মনে রাখতে পারো আমাদের বিশ্বাস সেক্ষেত্রে বড় প্রশ্নের উত্তর লিখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হবে না।

সঠিক উত্তর নির্বাচন কর (MCQ)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ১]

1। প্রথম বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে-
(ক) কলকাতায় (খ) হাওড়ায় (গ) বরিশালে (ঘ) মেদিনীপুরে

উত্তর- প্রথম বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে- (ঘ) মেদিনীপুরে।

2। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রধান ছিলেন-
(ক) সুশীল ধাড়া (খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত (গ) অজয় মুখোপাধ্যায় (ঘ) বীরেন্দ্রচন্দ্র শাসমল

উত্তর- তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রধান ছিলেন-(খ) সতীশচন্দ্র সামন্ত।

3। আজাদ হিন্দ বাহিনীর ‘ঝাঁসির রানি ব্রিগেড’ এর নেতৃত্ব দেন-
(ক) সরোজিনী নাইডু (খ) নন্দিতা কৃপালনী (গ)শান্তি দাশগুপ্ত (ঘ) লক্ষ্মী স্বামীনাথ

উত্তর- আজাদ হিন্দ বাহিনীর ‘ঝাঁসির রানি ব্রিগেড’ এর নেতৃত্ব দেন- (ঘ) লক্ষ্মী স্বামীনাথ।

4। রসিদ আলি দিবস হয় ১৯৪৬ এর
(ক) ১২ ফেব্রুয়ারি (খ) ১০ ফেব্রুয়ারি (গ) ১১ ফেব্রুয়ারি (ঘ) ২২ ফেব্রুয়ারি

উত্তর- রসিদ আলি দিবস হয় ১৯৪৬ এর- (ক) ১২ ফেব্রুয়ারি।

5। ইণ্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি গড়ে তোলেন-
(ক) সূর্য সেন (খ) অনন্ত সিংহ (গ) গণেশ ঘোষ (ঘ) নির্মল সেন

উত্তর- ইণ্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি গড়ে তোলেন- (ক) সূর্য সেন।

6। ১৯৩২ এর পুণা চুক্তি হয়-
(ক) আম্বেদকর ও গান্ধিজীর মধ্যে (খ) গান্ধিজী ও জিন্নার মধ্যে (গ) আম্বেদকর ও নেহেরুর মধ্যে (ঘ) আম্বেদকর ও ম্যাকডোনাল্ড এর মধ্যে

উত্তর- ১৯৩২ এর পুণা চুক্তি হয়- (ক) আম্বেদকর ও গান্ধিজীর মধ্যে।

7। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের-
(ক) ফাঁসি হয় (খ) দ্বীপান্তর হয় (গ) তিনি আত্মহনন করেন (ঘ) আজীবন কারাদণ্ড হয়

উত্তর- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের- (গ) তিনি আত্মহনন করেন।

8। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিলেন-
(ক) বেগম রোকেয়া (খ) হোসেনারা বেগম (গ) রাজিয়া খাতুন (ঘ) হালিমা খাতুন

উত্তর- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিলেন- (ক) বেগম রোকেয়া।

9। ভারত- জার্মানি বিপ্লবী ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন-
(ক) সিন্ধুবালা দেবী (খ) ননীবালা দেবী (গ) বগলাসুন্দরী দেবী (ঘ) বিন্ধবাসিনী দেবী

উত্তর- ভারত- জার্মানি বিপ্লবী ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন- (খ) ননীবালা দেবী।

10। নিয়ন সার্কুলার জারি করা হয়-
(ক) পূর্ববঙ্গে (খ) পশ্চিমবঙ্গে (গ) পাঞ্জাবে (ঘ) যুক্তপ্রদেশে

উত্তর- নিয়ন সার্কুলার জারি করা হয়- (ক) পূর্ববঙ্গে।

আরো পড়ুন → ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর আলোচনা

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (SAQ)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ২]

1। অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে কোন কোন নারী বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন?
উত্তর- গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনে এগিয়ে এসেছিলেন ও দেশাত্মোবোধ এ জাগ্রত হয়েছিলেন সমাজের প্রায় সমস্ত নারীরাই। বিদেশি দ্রব্য বর্জন করে নারীরা নিজের হতে চরকায় সুতো কেটে ও কাপড় বুনে স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান করেন। বাসন্তী দেবী(বাংলা),সরোজিনী নাইডু(হায়দ্রাবাদ), কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায় (কর্ণাটক), ঊর্মিলাদেবী, স্বরুপা রানী প্রমুখরা অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন।

2। ‘অলিন্দ যুদ্ধ’ কী?
উত্তর- ১৯৩০ সালের ৮ই ডিসেম্বর তিন অকুতোভয় বাঙালি বিপ্লবী বিনয়,বাদল,দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমন করে জেনারেল সিম্পসন কে হত্যা করেন। ইংরেজ পুলিশ বাহিনীর সাথে বিনয়,বাদল,দীনেশের রাইটার্স বিল্ডিং এর অলিন্দে গুলিবর্ষণ ও যুদ্ধ হয় তাই ইতিহাসে অলিন্দ যুদ্ধ নামে পরিচিত। রাইটার্স বিল্ডিং-এর অলিন্দে পুলিশের সঙ্গে তাদের সেই অসম যুদ্ধে টেয়ানাম, প্রেন্টিস, নেলসন প্রমুখ ব্রিটিশ অফিসারগণ গুলির আঘাতে আহত হন।

3। ‘রসিদ আলি দিবস’ কী?
উত্তর- ১৯৪৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি রসিদ আলি দিবস পালন করা হয়। রসিদ আলী ছিলেন আজাদ হিন্দ বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ১৯৪৬ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ বাহিনীর অফিসার রসিদ আলীর বিচার হয় ও তাকে সাত বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এরই প্রতিবাদে রাজপথে গণআন্দোলন সূচিত হয় ১১-১৩ই ফেব্রুয়ারি ও ১২তারিখ রসিদ আলি দিবস পালিত হয়।

4। নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া কেন একটা উল্লেখযোগ্য নাম?
উত্তর- বিংশ শতকের বাংলার সমাজে নারী শিক্ষার প্রগতি, নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নারী আন্দোলনে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এর ভূমিকা অগ্রগণ্য। তাঁর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল নারীর মানবাধিকার অর্জন। এই লক্ষ্যে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ও আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ নামে একটি নারীসমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯১৬ সালে। এই সমিতি নারী শিক্ষা,যৌতুক প্রথার অবসান সহ বহু সামাজিক কাজে নিযুক্ত হয়।

5। অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি কে গঠন করেন? কেন?
উত্তর- ১৯০৫ সালের নভেম্বর মাসে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু কার্লাইল সার্কুলার এর বিরুদ্ধে অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকার ছাত্র আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টায় কার্লাইল সার্কুলার প্রয়োগ করে ছাত্রদের মিছিল,সভা,সমিতি সমস্ত কিছু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এমনকি তাদের বন্দেমাতরম ধ্বনিতেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এই দমনমূলক সার্কুলার এর বিরুদ্ধেই এই অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি গঠিত হয়।

6। প্রিন্স অফ ওয়েলস ভারতে এলে ছাত্ররা কী ভাবে প্রতিবাদ জানায়?
উত্তর- ১৯২১ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রিন্স অফ ওয়েলস ভারত সফরে আসেন। এর প্রতিবাদে কংগ্রেস সারা ভারতব্যাপী হরতাল ডাকেও প্রতিবাদে অবতীর্ন হয়। এর পাশাপাশি ছাত্ররাও এই প্রতিবাদে যোগদান করে।

আরো পড়ুন → পথের দাবী – প্রশ্ন উত্তর

বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন উত্তর

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ৪]

1। অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর- ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ছাত্র সমাজ অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগদান করেন। এই ছাত্র আন্দোলনকে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার কার্লাইল সার্কুলার জারি করে ও এর ভিত্তিতে ছাত্রদের সমস্ত সভা সমিতি মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়, আরো বলা হয় যে যেসমস্ত ছাত্র বৃত্তি প্রাপ্ত ছিল তাদের বৃত্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে, ও বিদ্যালয়গুলির অনুমোদন ও বরাদ্দ অনুদান বাতিল করে দেওয়া হবে। ঢাকাতেও অনুরূপ ভাবে এমনই একটি সার্কুলার জারি করা হয় যার নাম লিয়নস সার্কুলার। এই দমনমূলক সার্কুলার এর বিরুদ্ধে ১৯০৫ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার রিপন কলেজে শচীন্দ্র নাথ বসু অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটি গড়ে তোলেন ও শচীন্দ্র নাথ বসু এর সম্পাদক নির্বাচিত হন ও সভাপতি নির্বাচিত হন কৃষ্ণ কুমার মিত্র। ছাত্ররা সরাসরি এই সার্কুলার প্রত্যাখ্যান করে। এই অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ১) ছাত্রদের জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ করা, ২) ছাত্রদের বিদেশি শিক্ষা বর্জন করে স্বদেশী শিক্ষায় আগ্রহ বৃদ্ধি করা ৩) যে সমস্ত ছাত্র শাস্তি পেয়েছে তাদের জন্য পৃথকভাবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা।
KeyPoints
কার্লাইল সার্কুলার ও তার কারণ – কার্লাইল সার্কুলারের ফলাফল – অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির প্রতিষ্ঠা – অ্যান্টি সার্কুলার সোসাইটির মূল উদ্দ্যেশ্য

2। কলকাতার ছাত্র সমাজ রসিদ আলি দিবস কী ভাবে পালন করেছিল?
উত্তর- ব্রিটিশদের হতে বন্দী আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রসিদ আলি। ১৯৪৬ সালে যুদ্ধবন্দি এই আজাদ হিন্দ বাহিনীর সেনার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এর প্রতিবাদে সাধারণ জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে ও প্রতিবাদে লিপ্ত হয়। বাংলায় ব্যাপকভাবে আন্দোলনের প্রভাব পড়তে থাকে, ১১, ১২ ও ১৩ই ফেব্রয়ারি কলকাতায় পরিস্থিতি ভয়ানক হয়ে ওঠে ও এই আন্দোলন গণ আন্দোলনে পর্যবসিত হয়। রসিদ আলীর শাস্তির বিরোধিতা করে মুসলিম ছাত্র লীগ ১১তারিখ ধর্মঘট পালন করে ও ১২ই ফেব্রুয়ারিকে রসিদ আলি দিবস হিসাবে পালন করার কথা ঘোষণা করে। মুসলিম ছাত্র লীগের সদস্য তথা সম্পাদক মোয়াজ্জম হোসেন ও সিটি ছাত্র ফেডরেশনের সম্পাদক গৌতম চট্টোপাধ্যায় কলকাতায় এক বিশাল জনসভা আয়োজন করেন। এই জনসভায় হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে অসংখ্য ছাত্র যোগ দেয় ও অন্নদাশংকর ভট্টাচার্য্য, শাহ আজিজুর রহমান এর মত ছাত্রনেতারা এই সভায় বক্তব্য পেশ করেন। উক্ত সভা শেষে একটি ছাত্রদল মিছিল শুরু করলে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ ঘটে যাতে পুলিশ গুলিসহ বিভিন্ন অস্ত্রের প্রয়োগ করে মিছিলের ওপর। এরই প্রতিবাদে ছাত্ররা ১২ই ফেব্রয়ারি দিনটিকে রসিদ আলি দিবস হিসাবে পালন করা হয়।
KeyPoints
রসিদ আলির পরিচিতি ও তার শাস্তি – প্রতিবাদ ও বাংলার পরিস্থিতি – রসিদ আলি দিবস – জনসভা আয়োজন ও প্রধান বক্তাদের নাম – জনসভার শেষে পুলিশের ভূমিকা

আরো পড়ুন → নাইট্রোজেন চক্র অধ্যায়ের প্রশ্ন উত্তর

রচনাধর্মী প্রশ্নউত্তর (LA)

[প্রতিটি প্রশ্নের প্রশ্নমান ৮]

1। বাংলার নারী আন্দোলনে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাড় ও কল্পনা দত্ত-কে ‘অগ্নিকন্যা’ বলা যেতে পারে।’ – আলোচনা করো।
উত্তর- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন প্রথম বাঙালি শহীদ নারী বিপ্লবী। যার কার্যক্রম সমগ্র ভারতের নারীদের কাছে তথা সমস্ত মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা প্রদান করে থাকে। প্রীতিলতার জীবনসংগ্রাম থেকে একজন মানুষ সেই শিক্ষা নিতে পারেন যে কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারেন একজন নারী। ১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এর সময় প্রীতিলতার বয়স ছিল মাত্র কুড়ি। সেই কর্মকাণ্ডে মাস্টারদার নেতৃত্ত্বে অংশগ্রহণ করেন ও পুলিশ যখন মাস্টারদা সহ তার দলের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় তখন প্রীতিলতা ও আরো দুয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সূর্য সেনের ভাবনাতেই পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলার পরিকল্পনা করা হয় ও এর নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব পড়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ওপরই। প্রীতিলতার নেতৃত্বে ১০ জনের একটি দল প্রস্তুতি নিতে থাকে সশস্ত্র আক্রমণের। সেই মতই ১৯৩২ সালের ২৩শ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমন করা হয় ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। ব্রিটিশদের গুলিতে আহত হলেও তাদের হাতে প্রাণ না দেওয়ার সংকল্প করে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে প্রাণত্যাগ করেন।
চট্টগ্রাম সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে এক চিরস্মরণীয় নাম কল্পনা দত্ত। অসীম সাহস ও বীরত্বের অধিকারিণী কল্পনা দত্তের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অবদান প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতই অনন্য। চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করা কল্পনা দত্ত মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ও পরিচালনায় ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমন করেন। বেথুন কলেজে পড়াকালীন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আগমন ও বিপ্লবী হবার প্রবল আকাঙ্খার সূত্রপাত। বেথুন কলেজে বিভিন্ন হরতাল ও আন্দোলনে যোগদান করতে শুরু করেন ও ক্রমে সূর্য সেনের ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি দলে যোগ দেন ও বোমা তৈরির জন্য গান কটন নির্মাণ করতে থাকেন। পরবর্তীতে মাস্টারদার সহযোগী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সংস্পর্শে এসে চট্টগ্রামের বিপ্লবী সংগঠন তথা সূর্য সেনের সাথে তার পরিচয় হয় ও চট্টগ্রামে তিনি রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও নারী সম্মেলনে যোগ দেন ও পরবর্তীতে সশস্ত্র আন্দোলনেও পূর্ণ যোগদান করেন। মাস্টারদার নেতৃত্বে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কলকাতায় এসে বোমার খোল সংগ্রহ করেন । শুধু চট্টগ্রামই নয় ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সমুদ্রতীরবর্তী গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গী ছিলেন কল্পনা দত্ত।
ফলে যথার্থই এই দুই বিপ্লবী নারীকে অগ্নিকন্যা আখ্যায় ভূষিত করা যুক্তিযুক্ত।
KeyPoints
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও তার পরিচিতি – মাস্টারদা সূর্য সেন ও প্রীতিলতা – ইউরোপিয়ান ক্লাবে হামলা ও প্রীতিলতার ভূমিকা – প্রীতিলতার আত্মহত্যা – কল্পনা দত্ত ও তার পরিচিতি – চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমন ও কল্পনা দত্ত – কল্পনা দত্তের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত – ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি দলে যোগ – চট্টগ্রামের বিপ্লবী সংগঠনে প্রবেশ – সশস্ত্র আন্দোলনে ভূমিকা – গৈরালা গ্রামে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে সংঘর্ষ

2। বিশ শতকের ভারতে দলিত আন্দোলনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর- ভারতের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সমস্ত ক্ষেত্রেই সেই আদিকাল থেকে নিম্নবর্ণের মানুষেরা উপেক্ষিত। দলিত হল তারাই যারা আর্থসামাজিক দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল ও দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানকারী। ঔপনিবেশিক ভারতে পাশ্চাত্যকরণের প্রভাবে দলিতদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায় ও তারাও শিক্ষা,চাকরি ইত্যাদির স্বাধীনতা ও প্রতিনিধিত্ব করার বিষয়ে ও চাহিদায় আন্দোলনে অবতীর্ন হয়।
ভারতীয় সমাজের চতুর্বর্ন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সমাজ সংস্কারক এগিয়ে আসেন ও নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের পক্ষে সওয়াল করেন। দক্ষিণ ভারতে নিম্নবর্গের আন্দোলনের সূত্রপাতে মুখ্য ভূমিকা নেন মহারাষ্ট্রের সমাজ – সংস্কারক জ্যোতিবা ফুলে। মহারাষ্ট্রের সমাজ বিপ্লবের নেতা জ্যোতিবা ফুলে সত্যশোধক সমাজ গঠন করে সমাজসংস্কারে ব্রতী হন। তিনি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখেন ‘ গুলামগিরিৎতে । তাঁর এই প্রচেষ্টাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান ও দক্ষিণ ভারতের দলিত আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান শ্রী নারায়ণ গুরু। তাঁর সামাজিক আন্দোলন দক্ষিণ ভারতের মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ভারতের দলিত আন্দোলনের ক্ষেত্রে যে নামটি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ন তিনি হলেন বি.আর.আম্বেদকর। আম্বেদকরই প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি উপলব্ধি করেন যে কেবলমাত্র সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে দলিত তথা সমাজের অস্পৃশ্য মানুষদের উন্নয়ন সম্ভব না। তাদের প্রয়োজন প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠন। আর এটা সম্ভব হতে পারে একমাত্র আধুনিক শিক্ষা দ্বারা তাদের শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমেই। আম্বেদকরের এই প্রচেষ্টার পথ ধরেই ১৯২০ সালে দলিত সহ্ অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর মানুষদের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর দাবির সূত্রপাত হয়। আইনসভা,সরকারি দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানগুলিতে দলিতদের জন্য আসন সংরক্ষণের দাবিও জোরালো হয়। ১৯৩২ সালে এই মর্মে বহু স্মারকলিপি জমা পড়ে সাইমন কমিশনের কাছে। বেশ কিছু হিন্দু ও উচ্চশ্রেণীর নেতারা এতে ক্ষুব্ধ হন। গান্ধীজি ও এতে অসন্তুষ্ট হন ও এই আসন সংরক্ষণের দাবিকে ঔপনিবেশিক শক্তির অপচেষ্টা বলে ব্যক্ত করেন। এরপর পুনাতে আম্বেদকরের সাথে গান্ধীর দুটি গোলটেবিল বৈঠক বসলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে ও শেষপর্যন্ত নিম্ন শ্রেণীর সাথে উচ্চ শ্রেণীর আপসরফা হয়। গান্ধীজি মেনে নেন ১৪৮টি অনগ্রসর শ্রেণীর সংরক্ষণ যা স্থায়ী হবে পরবর্তী ১০বছর। আম্বেদকরের সাথে গান্ধীর এই চুক্তি পুনা চুক্তি নামে খ্যাত(১৯৩২)। এরপর দলিত আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কিছু সংগঠন গড়ে তোলা হয়। যেগুলির মধ্যে আম্বেদকর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি, অল ইন্ডিয়া সিডিউল কাস্ট ফেডারেশন(১৯৪২) গুরুত্বপূর্ন।
KeyPoints
দলিত কারা – দলিতদের উপর পাশ্চাত্যকরণের প্রভাব – জ্যোতিবা ফুলের সমাজসংস্কার – দক্ষিণ ভারতের দলিত আন্দোলনে ভূমিকা – বি.আর.আম্বেদকর ও ভারতের দলিত আন্দোলন -দলিতদের সুরক্ষায় জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে আসন সংরক্ষণ – এর প্রতিবাদ ও আম্বেদকরের সাথে গান্ধীর গোলটেবিল বৈঠক – পুনা চুক্তি – দলিত আন্দোলন ও তার সমর্থনে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা

আরো পড়ুন → বিশ শতকের ভারতে কৃষক, শ্রমিক ও বামপন্থী আন্দোলন প্রশ্ন ও উত্তর

WBPorashona.com-এর পোস্ট আপডেট নিয়মিত পাবার জন্য –


আমাদের কাজ থেকে উপকৃত হলে এই লেখাটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।

WBP-YT-Banner